কক্সবাজার জেলার ইতিহাস, দর্শনীয় স্থান ও তথ্য সমূহ

এই পোষ্টে বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার নানা জায়গা সহ কক্সবাজারের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে

কক্সবাজার জেলা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগের একটি জেলা যা চট্টগ্রামের ১৫০ কিলোমিটার (৯৩ মাইল) দক্ষিণে অবস্থিত৷ এটি বাংলাদেশের অন্যতম মৎস্য বন্দর। কক্সবাজারে বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকতগুলির মধ্যে একটি {১২০ কিলোমিটার প্রায়(৭৫ মাইল প্রায়) কাদা সমতল সহ দীর্ঘ}। এর উত্তরে চট্টগ্রাম জেলা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে বান্দরবান জেলা এবং পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর। প্রধান নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে মাতামুহুরী, বকখালী, রেজু খাল, নাফ নদী, মহেশখালী চ্যানেল এবং কুতুবদিয়া চ্যানেল।

কক্সবাজার বাংলাদেশের একটি প্রধান পর্যটন কেন্দ্র। এটি বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকতের আবাসস্থল, যা সাঁতার কাটা, সূর্য স্নান এবং সার্ফিংয়ের জন্য একটি জনপ্রিয় গন্তব্য। এছাড়াও জেলাটি হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান, কক্সবাজার পার্বত্য অঞ্চল এবং টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সহ অন্যান্য অনেক পর্যটন আকর্ষণের আবাসস্থল। কক্সবাজারের অর্থনীতি পর্যটন, মাছ ধরা, এবং কৃষির উপর ভিত্তি করে। জেলাটি ধান, পাট ও মাছের প্রধান উৎপাদক। কক্সবাজারে পোশাক শিল্প, পর্যটন শিল্প এবং মাছ ধরার শিল্প সহ বেশ কয়েকটি শিল্পের আবাসস্থল।

কক্সবাজার নামটি ১৮ শতকের শেষের দিক থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এটি একটি জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য এবং এটি বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সৈকতের একটি। এছাড়াও জেলাটিতে রামু বৌদ্ধ মন্দির এবং উখিয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির সহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থান রয়েছে।

Cox-Bazar-District

কক্সবাজার জেলার ইতিহাস

কক্সবাজার জেলার নামকরণ করা হয়েছে কক্সবাজার শহরের নামানুসারে। কক্সবাজার পানোয়া ("হলুদ ফুল") নামেও পরিচিত। আরেকটি পুরানো নাম ছিল পালংকি।

আধুনিক কক্সবাজারের নাম ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অফিসার ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স (মৃত্যু ১৭৯৯) থেকে এসেছে যিনি ব্রিটিশ ভারতে কর্মরত একজন সেনা অফিসার। তিনি ১৭৭৩ সালে পালোঙ্কি (আজকের কক্সবাজার) ফাঁড়ির সুপারিনটেনডেন্ট হিসাবে নিযুক্ত হন। কক্স ১৭৮৪ সালে বার্মিজদের আরাকান বিজয়ের পর স্বদেশ থেকে পালিয়ে আসা আরাকানি উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য দায়ী ছিলেন। তিনি শহরে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর নামকরণ করেন। নিজের পরে বাজারটি শেষ পর্যন্ত একটি শহরে এবং তারপর একটি জেলায় পরিণত হয়, যার নামকরণ করা হয় তার সম্মানে কক্সবাজার।

কক্সবাজার জেলার থানা/উপজেলা সমূহ

কক্সবাজার জেলায় সাতটি থানা/উপজেলা রয়েছে, যা হলো:

  1. কক্সবাজার সদর উপজেলা,
  2. চকরিয়া উপজেলা,
  3. কুতুবদিয়া উপজেলা,
  4. উখিয়া উপজেলা,
  5. মহেশখালী উপজেলা,
  6. পেকুয়া উপজেলা,
  7. রামু উপজেলা,
  8. টেকনাফ উপজেলা।

কক্সবাজার জেলার দর্শনীয় স্থান সমূহ

কক্সবাজার বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত এবং এর দীর্ঘ বালুকাময় সমুদ্র সৈকতের জন্য বেশি পরিচিত। জেলাটি বেশ কয়েকটি পর্যটন আকর্ষণের আবাসস্থল, যার মধ্যে রয়েছে:

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত

বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত একটি জনপ্রিয় পর্যটন স্থান। দর্শনার্থীরা সাঁতার কাটা, সূর্যস্নান এবং সমুদ্র সৈকতে হাঁটা উপভোগ করতে পারেন।

ইনানী সমুদ্র সৈকত

ইনানী সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি নির্জন সৈকত। সৈকত তার সাদা বালি এবং স্বচ্ছ জলের জন্য পরিচিত।

হিমছড়ি জলপ্রপাত

হিমছড়ি জলপ্রপাত হল একটি সুন্দর জলপ্রপাত যা কক্সবাজার থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। জলপ্রপাতটি একটি জনপ্রিয় পিকনিক স্পট এবং আশেপাশের পাহাড়ের অত্যাশ্চর্য দৃশ্য দেখায়।

সেন্ট মার্টিন দ্বীপ

কক্সবাজার থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি ছোট দ্বীপ সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। দ্বীপটি তার সাদা বালির সৈকত, স্বচ্ছ জল এবং নারকেল পামের জন্য পরিচিত।

কুতুবদিয়া দ্বীপ

কুতুবদিয়া দ্বীপ কক্সবাজার থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি ছোট দ্বীপ। দ্বীপটি কুতুবদিয়া বাতিঘর সহ বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থানের আবাসস্থল।

রামু উপজেলা

রামু উপজেলা কক্সবাজার জেলায় অবস্থিত একটি বৌদ্ধ-প্রধান উপজেলা। উপজেলাটিতে রামু বুদ্ধ ধাতু বিহার সহ বেশ কয়েকটি বৌদ্ধ বিহার ও মন্দির রয়েছে।

মহেশখালী দ্বীপ

মহেশখালী দ্বীপ কক্সবাজার জেলায় অবস্থিত একটি বিশাল দ্বীপ। দ্বীপটি বেশ কয়েকটি সৈকত, বন এবং গ্রামের বাড়ি।

রেডিয়েন্ট ফিশ ওয়ার্ল্ড

রেডিয়েন্ট ফিশ ওয়ার্ল্ড কক্সবাজারে অবস্থিত একটি অ্যাকোয়ারিয়াম। অ্যাকোয়ারিয়ামটি হাঙ্গর, রশ্মি এবং মাছ সহ বিভিন্ন ধরণের সামুদ্রিক জীবনের আবাসস্থল।

মেরিন ড্রাইভ

মেরিন ড্রাইভ হল একটি ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তা যা কক্সবাজারের উপকূল বরাবর চলে। রাস্তাটি বঙ্গোপসাগরের অত্যাশ্চর্য দৃশ্য দেখায় এবং এটি হাঁটা, জগিং এবং সাইকেল চালানোর জন্য একটি জনপ্রিয় স্থান।

কক্সবাজার জেলার অনেক পর্যটন আকর্ষণের মধ্যে এগুলি কয়েকটি মাত্র। জেলাটি সারা বিশ্বের পর্যটকদের জন্য একটি জনপ্রিয় গন্তব্য এবং প্রত্যেকের জন্য কিছু অফার করে।

কক্সবাজার জেলার পার্ক সমূহ

কক্সবাজার জেলায় বেশ কিছু পার্ক রয়েছে। কিছু জনপ্রিয় পার্কের মধ্যে রয়েছে:

  • হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান: কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলায় এই উদ্যানটি অবস্থিত। এটি প্রায় ১,৭২৯ হেক্টর এলাকা জুড়ে এবং বাঘ, হাতি, হরিণ এবং বানর সহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল।
  • ডুলাহাজরা সাফারি পার্ক: কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলায় এই পার্কটি অবস্থিত। এটি প্রায় ২,২২৪ হেক্টর এলাকা জুড়ে এবং সিংহ, বাঘ, ভাল্লুক এবং বানর সহ বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থল।
  • সাবরাং পর্যটন পার্ক: এই পার্কটি কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলায় অবস্থিত। এটি প্রায় ১০২৭ হেক্টর এলাকা জুড়ে রয়েছে এবং এটি বিভিন্ন গাছপালা এবং প্রাণীর আবাসস্থল।

এই পার্কগুলি দর্শনার্থীদের জন্য হাইকিং, ক্যাম্পিং, সাঁতার কাটা এবং মাছ ধরা সহ বিভিন্ন ধরণের ক্রিয়াকলাপ অফার করে। কক্সবাজার জেলার প্রাকৃতিক পরিবেশ সম্পর্কে জানার জন্যও এগুলি একটি দুর্দান্ত জায়গা।

যে কারনে কক্সবাজার জেলা বিখ্যাত

কক্সবাজার জেলা বিভিন্ন কারণে বিখ্যাত, যার মধ্যে রয়েছে:

  • এর দীর্ঘ, বালুকাময় সৈকত: কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত হল বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত, যা ১২০ কিলোমিটারেরও বেশি বিস্তৃত। এটি সারা বিশ্বের পর্যটকদের জন্য একটি জনপ্রিয় গন্তব্য, যারা এর সৌন্দর্য, এর সাঁতার কাটা এবং সার্ফিং এবং এর সূর্যাস্ত উপভোগ করতে আসে।
  • এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য: কক্সবাজার জেলা বন, পাহাড় এবং নদী সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক আকর্ষণের বাড়ি। এই আকর্ষণগুলি হাইকিং, ক্যাম্পিং এবং মাছ ধরার সুযোগ প্রদান করে।
  • এর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য: কক্সবাজার জেলা বাঙালি, চাকমা, মারমা এবং রোহিঙ্গা সহ বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠীর আবাসস্থল। এই বৈচিত্র্য প্রতিফলিত হয়েছে জেলার সংস্কৃতিতে, যা বিভিন্ন ঐতিহ্যের মিশ্রন।
  • এর আতিথেয়তা: আতিথেয়তার জন্য পরিচিত কক্সবাজারের মানুষ। তারা সর্বদা দর্শকদের স্বাগত জানাতে এবং তাদের বাড়িতে অনুভব করতে ইচ্ছুক।

এসব কারণে কক্সবাজার জেলা একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। এটি এমন একটি জায়গা যেখানে দর্শনার্থীরা প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে, বিভিন্ন সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারে এবং মানুষের আতিথেয়তা অনুভব করতে পারে।

এখানে কক্সবাজার জেলার আকর্ষণ সম্পর্কে কিছু আরও কিছু বিবরণ রয়েছে:

  • কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত: সৈকতটি জেলার প্রধান আকর্ষণ। এটি একটি দীর্ঘ, স্বচ্ছ জল সহ বালুকাময় সৈকত। সমুদ্র সৈকত সাঁতার কাটা, সানবাথিং এবং সার্ফিংয়ের জন্য একটি জনপ্রিয় স্থান।
  • হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান: হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান কক্সবাজারের নিকটে অবস্থিত একটি রেইনফরেস্ট। পার্কটি বাঘ, হাতি এবং হরিণ সহ বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থল।
  • মহেশখালী দ্বীপ: মহেশখালী দ্বীপ কক্সবাজারের উপকূলে অবস্থিত একটি দ্বীপ। দ্বীপটি বিভিন্ন সৈকত, বন এবং গ্রামগুলির আবাসস্থল।
  • সেন্ট মার্টিন দ্বীপ: সেন্ট মার্টিন দ্বীপ কক্সবাজার উপকূলে অবস্থিত একটি প্রবাল দ্বীপ। দ্বীপটি বিভিন্ন সৈকত, বন এবং গ্রামের বাড়ি।

কক্সবাজার জেলা একটি সুন্দর এবং বৈচিত্র্যময় স্থান যেখানে দর্শনার্থীদের জন্য অনেক কিছু রয়েছে। আপনি যদি বিশ্রাম নেওয়ার এবং বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জায়গা খুঁজছেন, তাহলে কক্সবাজার হল নিখুঁত গন্তব্যস্থল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন